সনাতন ধর্মে  পরমতসহিষ্ণুতা ও সামাজিক সহাবস্থান
সনাতন ধর্মে পরমতসহিষ্ণুতা ও সামাজিক সহাবস্থান
✍ অক্ষয় লীলা মাধব দাস
১৫ জুলাই ২০২৬
বর্ষ: 2025  |  ইস্যু: ২য় সংখ্যা

সনাতন ধর্মের মূলনীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম —  “বসুধৈব কুটুম্বকম”। মহা উপনিষদে (৬.৭১-৭৫) উক্ত পুরো শ্লোকটিতে বলা হয়েছে —  “অয়ং নিজঃ পরোবেতি গণনা লঘুচেতসাম। উদার চরিতানাম্ তু বসুধৈব কুটুম্বকম্ ।।” স্বার্থপর মানুষ এটা আমার, ওটা অন্যের —  এই ভাব পোষণ করে। উদারচেতনাসম্পন্ন মানুষ এই বসুধা অর্থাৎ, পৃথিবীর সকলকে কুটুম্ব বা একই পরিবারভুক্ত বলে মনে করে। এই শিক্ষা যদি কেউ হৃদয়ে লালন করে, তবে পৃথিবীর কোনো ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর দ্বেষভাব সম্ভব নয়। কারণ, বর্তমান পৃথিবীতে যত দ্বন্দ্ব-বিদ্বেষ, সবকিছুর মূলে হলো এটা আমার, ওটা আপনার —  এই ভাব। এ কারণেই পৃথিবীব্যাপী দেয়ালের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে ।

শেতাশ্বতর উপনিষদে (২.৫) বলা হয়েছে “শৃণন্তু বিশ্বেঅমৃতস্য পুত্রা”। এখানে সমগ্র মানবজাতিকে অমৃতস্য পুত্র বলে অভিহিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, আমরা সকলেই এক পরমেশ্বর ভগবান বা স্রষ্টার সন্তান। সৃষ্টিকর্তা একজনই, তাকে হয়ত একেকজন একেক নামে অভিহিত করতে পারেন। ঠিক যেমন জলকে ডধঃবৎ বললে, জলই বোঝায়, অন্য কোনো বস্তু নয়, তেমনি পরমেশ্বর ভগবানকে এড়ফ, আল্লাহ, জিহোভা যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, তিনি এক ও অভিন্ন —  “একমেব অদ্বিতীয়ম্”। এই দর্শন এতটাই উদার যে, তাতে পরস্পর সহাবস্থান নিয়ে দ্বন্দ্বের কোনো অবকাশ নেই।

  শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (১৮.৬১) পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, “ঈশ্বর সর্বভূতানাং হৃদ্দেশে অজুর্ন তিষ্ঠতি” —  পরমেশ্বর ভগবান সকল জীবের হৃদয়ে বিরাজ করেন। গীতায় (২৯.৯) আরো বলা হয়েছে, “সমোহং সর্বভূতেষু” অর্থাৎ, তিনি সকল জীবের প্রতি সমদর্শী। কোনো দর্শন বা মতাদর্শ অনুসরণকারীদের প্রতি তিনি পক্ষপাতদুষ্ট নন। এখানেও সনাতন ধর্মের সর্বজনীনতার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সনাতন শাস্ত্র সর্বদাই সহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয়। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (১২.১৩-১৪) ভগবান তাঁর প্রিয় ভক্তের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন —  “যিনি সমস্ত জীবের প্রতি দ্বেষশূন্য, বন্ধুভাবাপন্ন, কৃপালু, নিরহংকার, সুখে ও দুঃখে সমভাবাপন্ন, ক্ষমাশীল তিনি আমার প্রিয় ভক্ত।”

সনাতন ধর্মীয় দর্শনসমূহের অন্যতম বৈষ্ণব দর্শনের প্রচারক শ্রীচৈতন্যদেবের উদারতার কথা জানে না, এমন ব্যক্তি পাওয়া দুর্লভ। ব্রাহ্মণ্যবাদের উত্থান ও জাতভেদ যখন সমাজে ছেয়ে যাচ্ছিল, শ্রীচৈতন্যদেব আবার মানবপ্রেমের অমিয় বাণী প্রচার করে সমন্বয়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। ধনী—গরীব, উঁচু-নিচু, হিন্দু-মুসলিম সকল ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে তিনি এমন এক দর্শন প্রচার করলেন, যার শিক্ষায় আজ সমগ্র বিশ্বব্যাপী বৈষ্ণব দর্শন প্রচারিত হচ্ছে।

বৃহদারণ্যক উপনিষদে (১.৪.১৪) বলা হয়েছে —  সর্বে ভবন্তু সুখিন, সর্বে সন্তু নিরাময়া, সর্বে ভদ্রানি পশ্যন্তু, মা কশ্চিদ দুঃখ মাপ্নুয়াত, ওম শান্তি শান্তি শান্তি। অর্থাৎ, সবাই যেন সুখী হয়, সকলে যেন নিরাময় হয়, সকল মানুষ পরম শান্তি লাভ করুক, কখনো যেন কেউ দুঃখ বোধ না করেন। সকলেই শান্তি লাভ করুন। এই শ্লোক থেকেও স্পষ্ট হয়, সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্রসমূহ কতটা নিরপেক্ষ ও উদার দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন। যদি শাস্ত্রের এসকল নির্দেশ সমগ্র মানবজাতি অনুসরণ করে, তবে কখনো পৃথিবীতে হানাহানি, দ্বন্দ্বভাব থাকবে না। এই ধরণীতে আমরা তখন এক সৃষ্টিকর্তার সন্তান হিসেবে একটি পরিবারের মতো বসবাস করতে পারবো। – হরেকৃষ্ণ

সংকটে ভগবানের নাম জপ  কেন করবেন?
সংকটে ভগবানের নাম জপ কেন করবেন?
শ্রীনৃসিংহ চতুর্দশী
শ্রীনৃসিংহ চতুর্দশী
শ্রীরামচন্দ্রের  আবির্ভাব
শ্রীরামচন্দ্রের আবির্ভাব
শুদ্ধভাবে হরিনাম জপের  আটটি ব্যবহারিক কৌশল
শুদ্ধভাবে হরিনাম জপের আটটি ব্যবহারিক কৌশল
সুখের মাপকাঠি
সুখের মাপকাঠি
ধার্মিকের গুণাবলি কেমন  হওয়া উচিত?
ধার্মিকের গুণাবলি কেমন হওয়া উচিত?
বৈদিক শাস্ত্রে  তিন মহীয়সী মাতা
বৈদিক শাস্ত্রে তিন মহীয়সী মাতা
সনাতন ধর্মে  পরমতসহিষ্ণুতা ও সামাজিক সহাবস্থান
সনাতন ধর্মে পরমতসহিষ্ণুতা ও সামাজিক সহাবস্থান
প্রতিকূল পরিস্থিতিতে  কীভাবে স্থির থাকবেন?
প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কীভাবে স্থির থাকবেন?
শ্রীজীবের ষট্সন্দর্ভ
শ্রীজীবের ষট্সন্দর্ভ