আপনি যদি কোনো বিপদের মধ্যে পড়েন, ভগবানের পবিত্র নাম জপ করুন এবং দেখুন কী হয়!
প্রভুপাদ এই বিষয়টি খুব সুন্দরভাবে প্রমাণ করেছিলেন। চল্লিশের দশকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, তখন কলকাতায় বোমা পড়ার হুমকি ছিল। জাপানিরা কলকাতায় বোমা ফেলবে এমন সম্ভাবনা ছিল, কারণ কলকাতা ছিল ব্রিটিশদের একটি বড় ঘাঁটি। সেসময় সবাই কলকাতা ছেড়ে পালাচ্ছিল। সবাই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু প্রভুপাদ কী করলেন? তিনি একটি মৃদঙ্গ নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন এবং পবিত্র নাম কীর্তন শুরু করলেন।
প্রভুপাদের যুক্তি ছিল, “আমি যদি ভগবানের পবিত্র নাম জপ করি, তবে কৃষ্ণ আমাকে রক্ষা করবেন। আর যদি কৃষ্ণ রক্ষা না করেন, যদি আমার মৃত্যু হয়, তবে আমি ভগবানের পবিত্র নাম জপ করতে করতেই মারা যাব, ফলে আমি ভগবানের কাছে ফিরে যাব।” দুইভাবেই লাভ — হয় কৃষ্ণ রক্ষা করবেন, নয়তো তাঁর পবিত্র নাম জপ করতে করতে মৃত্যুবরণ করলে মুক্তি লাভ করব।
তাহলে জাপানিরা কি শেষ পর্যন্ত কলকাতায় বোমা ফেলেছিল? না। কেন ফেলেনি? অনেকে তা জানে না। কিন্তু প্রকৃত কারণ হলো, প্রভুপাদ তখন হরিনাম করছিলেন, আর কৃষ্ণ কলকাতাকে রক্ষা করেছিলেন। এটা পবিত্র নামের শক্তি।
আশির দশকের মাঝামাঝি রাশিয়ায় তথাকথিত সাম্যবাদ (কমিউনিজম)—এর পতন ঘটেছিল। তার আগে রাশিয়া ছিল একটি কঠোর কমিউনিস্ট দেশ। কিন্তু তখনও কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন সেখানে বিস্তার লাভ করছিল। আসলে কৃষ্ণভাবনার বিস্তারই কমিউনিজম পতনের প্রধান কারণ। এই শক্তিই রাশিয়াকে মুক্ত করেছিল।
এটা ভগবানের দিব্য নামের মহাশক্তি। সাধারণ লোক এটা বুঝবে না, কিন্তু ভক্তরা জানে এবং সেই থেকেই আমাদের ভগবানের নামের প্রতি আস্থা আরো দৃঢ় হয়।
এটা কি অন্ধ বিশ্বাস? না। এটা বাস্তব। তার প্রমাণ রয়েছে।
একবার এক ইউরোপীয় তরুণী প্রভুপাদের গ্রন্থ বিতরণ করছিল। তখন এক মাতাল তাকে আক্রমণ করতে এলো। চারপাশে কেউ ছিল না। সেই তরুণী সঙ্গে সঙ্গে জপ করতে লাগল — “নমস্তে নারসিংহায় প্রহ্লাদাহ্লাদ-দায়িনে”। অদ্ভুতভাবে, সেই লোকটা ঘুরে দাঁড়িয়ে চলে গেল।
একই রকম আরেকটি ঘটনা জার্মানির হামবুর্গ শহরে ঘটেছিল। সেখানে ভক্তরা একটি খুব পাপী অঞ্চলে হরিনাম করছিল। রাতের বেলায় সেই অঞ্চলটি মাতাল, বার আর ক্লাব দিয়ে ভর্তি থাকতো। ভক্তরা ভাবতেন — যাঁরা পাপী, তাঁরা চৈতন্য মহাপ্রভুর করুণার সবচেয়ে উপযুক্ত। তাই তাঁরা সেখানে গিয়ে নাম করতেন।
একদিন এক বিশালদেহী মাতাল লোক ভক্তদের আক্রমণ করতে আসছিল। ভক্তরা কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না। তারা দৌড়াতে পারতেন, কিন্তু তার বদলে তারা সবাই জপ করতে শুরু করলেন — নমস্তে নারসিংহায়...। আর তখন সেই লোকটি হঠাৎ আকাশে উঠে মাটিতে পড়ে গেল। এরপর অ্যাম্বুলেন্স এলো এবং ডাক্তার জানালেন — সে হার্ট অ্যাটাক করেছিল। কিন্তু সেটা কি সত্যিই হার্ট অ্যাটাক ছিল? না। সেটা ছিল নরসিংহদেবের হস্তক্ষেপ।
তাঁর দিব্য নামের আশ্রয় নিলে কৃষ্ণ নিজেই রক্ষা করেন। তাই তাঁর নামের আশ্রয় গ্রহণ করুন, চিন্তা করবেন না। বিপদ আসবে, যাবে, কিন্তু আপনি যদি ভগবানের দিব্য নামের আশ্রয় নেন, তাহলে কেবল বিপদ থেকে রক্ষা পাবেন না, বরং আধ্যাত্মিক উন্নতিও হবে। আপনি অনুভব করবেন আপনার হৃদয়ে কৃষ্ণপ্রেম জন্ম নিচ্ছে। আর কৃষ্ণপ্রেমই আমাদের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
কখনো কখনো কিছু কষ্ট আসবে, কিন্তু তা শুধু বাহ্যিকভাবে কষ্ট, তা আসল কষ্ট নয়।
ফ্রান্সে আরেক ঘটনায়, এক বিশালদেহী মাতাল লোক মন্দিরে ঢুকে ক্ষতি করার চেষ্টা করে। তখন একজন ছোঁখাটো ভক্ত পূজারির দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ভয় না পেয়ে ভগবানের শ্রীবিগ্রহ রক্ষা করতে ছুটে যান এবং সেই বিশাল লোকটিকে মন্দির থেকে বের করে দেন। পরে তিনি নিজেই বলেন — তিনি বুঝতেই পারেননি কীভাবে এটা করলেন। যেন তিনি কারো দ্বারা চালিত হচ্ছিলেন।
এরকম বহু ঘটনার সাক্ষী ভক্তরা। অনেকেরই এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে। তাঁর দিব্য নামের আশ্রয় নিলে কৃষ্ণ নিজেই রক্ষা করেন। তাই তাঁর নামের আশ্রয় গ্রহণ করুন, চিন্তা করবেন না।
বিপদ আসবে, যাবে, কিন্তু আপনি যদি ভগবানের দিব্য নামের আশ্রয় নেন, তাহলে কেবল বিপদ থেকে রক্ষা পাবেন না, বরং আধ্যাত্মিক উন্নতিও হবে। আপনি অনুভব করবেন আপনার হৃদয়ে কৃষ্ণপ্রেম জন্ম নিচ্ছে। আর কৃষ্ণপ্রেমই আমাদের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
কখনো কখনো কিছু কষ্ট আসবে, কিন্তু তা শুধু বাহ্যিকভাবে কষ্ট, তা আসল কষ্ট নয়। যেমন পাণ্ডবরা-তারা বাইরের দৃষ্টিতে অনেক কষ্টে ছিলেন, বনবাস, বিপদ। কিন্তু তারা কি কষ্টে ছিলেন? না, তারা ঈশ্বরের সান্নিধ্যে আনন্দে ছিলেন। আপনি যদি বনভোজন করতে যান, বাইরের লোক ভাবতে পারে আপনি কষ্টে আছেন — না খাবার, না ঘর। কিন্তু আপনি জানেন আপনি আনন্দে আছেন।
পশ্চিমে অনেক ভক্ত ধনী পরিবার থেকে এসেছেন। তাঁদের আত্মীয়রা যখন দেখে যে ২৫ জন এক কক্ষে ঘুমাচ্ছেন, মেঝেতে শুয়ে থাকেন, কোনো বিছানা নেই, মাংস খাচ্ছেন না, সিনেমা দেখছেন না — তখন তারা ভাবে, “আহারে, কী কষ্টে আছে!” কিন্তু ভক্তরা কি আসলেই কষ্টে আছেন? না, তারা আনন্দে আছেন।
আসল সুখ আমাদের বাইরের অবস্থায় নয়, হৃদয়ের অবস্থায়। যদি হৃদয় সুখী হয়, তাহলে বাইরে যেমনই হোক, আমরা সুখী থাকি। কিন্তু যদি হৃদয় কষ্টে থাকে, তাহলে বাইরের সমস্ত আরাম থাকা সত্ত্বেও কেউ সুখী হতে পারে না।
কেউ রাজপ্রাসাদে থাকতে পারে, অনেক টাকা থাকতে পারে, কিন্তু যদি সে ক্যান্সারে ভোগে, তাহলে কি সে সুখী হতে পারে?
আর অন্যদিকে কেউ খুব সাধারণ অবস্থায় জীবনযাপন করলেও, যদি অন্তরে সুখী থাকে, সেটাই আসল সুখ। তাই প্রভুপাদ বলেন, “হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করুন এবং সুখী হোন”।
ইস্কন সন্ন্যাসী ও দীক্ষাগুরু [শ্রীমদ্ভাগবতম ১.১৫.৩৪ এর ভাষ্য বক্তব্য থেকে সংগৃহীত]