যোগ ও আসন কি একই?
যোগ ও আসন কি একই?
✍ সত্যরাজ দাস
২৯ জুলাই ২০২৬
বর্ষ: 2025  |  ইস্যু: ২য় সংখ্যা

বর্তমানে ‘Yoga’ (ইয়োগা) বা ‘যোগ’ সম্পর্কে প্রায় সবারই কম—বেশি ধারণা আছে। তবে, তারা কি বিষয়টি পুরোপুরি জানে?

   এটি পশ্চিমা বিশ্বে এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়। ণড়মধ তড়হব ডিভিডি ও ভিডিও বিক্রি যে এখন কোটি টাকার ব্যবসা Koch Vision-এর সাধারণ ব্যবস্থাপক ড্যান গার্লিটজ তার এক বক্তব্যে তা তুলে ধরেছেন। কিম্বারলি লিওনার্ড US News & World Report—এ লিখেছিলেন, “গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে যোগাভ্যাসকারীদের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২১ মিলিয়নে পৌঁছেছে।” অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোতেও এ সংখ্যা প্রায় একই হারে বাড়ছে।

   পশ্চিমা বিশ্বে অধিকাংশ যোগাভ্যাসকারীদের যদি জিজ্ঞেস করেন, “যোগ আসলে কী? ” খুব সম্ভবত আপনি এরকম কিছু উত্তর পাবেন —  “এটি আমাকে ভালো অনুভব করায়”, “এটি উদ্দীপ্ত করে”, “এটি শরীর ও মনকে শিথিল করে”, “এটি একটি ভালো ব্যায়াম” অথবা “এটি আমাকে সুস্থ রাখে” ইত্যাদি।

   প্রায় প্রতিটি উত্তর যোগাভ্যাসের শারীরিক দিক সম্পর্কিত। এসব উত্তর থেকে মনে হতে পারে যোগ শুধু একটি ব্যায়াম পদ্ধতি অথবা এটি শরীর, মন ও আত্মাকে সুসংগঠিত রাখার একটি উপায়মাত্র।

  কিন্তু যোগ সম্পর্কে এই শরীর—কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নতুন। ঐতিহ্যগতভাবে, যোগ ছিল একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন। এমনকি প্রাচীন ঐতিহাসিক পতঞ্জলি তার যোগসূত্রে আসন (অবস্থান) ও প্রাণায়াম (শ্বাস নিয়ন্ত্রণ)—এর গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছিলেন, যা আজকের যুগে যোগীদের মধ্যে খুব জনপ্রিয়। বর্তমানে যে শারীরিক ব্যায়ামকে হঠ—যোগ বলা হয়, পতঞ্জলি তার যোগসূত্রে যোগকে তার চেয়ে অধিক আধ্যাত্মিকভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তিনি শুধু শারীরিক অনুশীলনের পরিবর্তে ধ্যানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। আসন ও প্রাণায়াম যোগের মূল উদ্দেশ্য নয়। মনের শান্তির জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল যা আধ্যাত্মিক লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করে, সেটিই যোগের মূল উদ্দেশ্য। পতঞ্জলির দ্বিতীয় সূত্রে যোগকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে —  যোগশ চিত্তবৃত্তি নিরোধঃ —  “যোগ হলো মনের চিন্তা প্রবাহের নিয়ন্ত্রণ।” অর্থাৎ, যোগ হলো সেই পন্থা, যা আমাদের গতানুগতিক মানসিক চিন্তাধারার বাইরে নিয়ে যায়; এটি মনের অস্বস্তিকর অস্থিরতাগুলো নিয়ন্ত্রণ করার একটি পদ্ধতি। প্রকৃতপক্ষে, পুরো অনুশীলনটির লক্ষ্য হলো শরীর ও মনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জন। জানতে চান, এ নিয়ন্ত্রণ কেন প্রয়োজন? প্রাচীন যুগের মহান যোগীরা আধ্যাত্মিকতার অনুসন্ধান করার জন্য শরীর ও মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করতে চেয়েছিলেন। এটি ছিল যোগাভ্যাসের আসল উদ্দেশ্য। সম্প্রতি স্বামী সচ্চিদানন্দ তার পতঞ্জলির যোগসূত্রের ভাষ্যে এই দৃষ্টিভঙ্গিটি নিশ্চিত করেছেন।

   যখন ‘যোগ’ শব্দটি বলা হয়, বেশিরভাগ মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংকোচন—প্রসারণ ও মানসিক চাপ কমানোর কিছু শারীরিক অনুশীলনের কথা ভাবেন। এটি যোগ বিজ্ঞানের একটি দিক, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি যোগের খুব ক্ষুদ্র একটি অংশ এবং তা সম্প্রতি বিকাশ লাভ করেছে। শারীরিক যোগ বা হঠযোগ মূলত যোগের প্রকৃত অনুশীলনকে সহায়তা করার জন্য তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ, মনকে বোঝার এবং তার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করার জন্য এটি এমন একটি মাধ্যম যার সাহায্যে একসময় ব্যক্তি আত্মাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়।

ভক্তির দিকে অগ্রগতি

যোগ শব্দের অর্থ ‘সংযোগ’। আধুনিক অনুশীলনকারীরা শরীর, মন ও আত্মার মেল—বন্ধনের যে মাধ্যম হিসেবে যোগকে দেখছে, এটি তার চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। এমন নয় যে এখানে শরীরকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। শরীর ঈশ্বরের সেবা করার জন্য একটি অপরিহার্য উপাদান। ভগবানের সেবা সুন্দরভাবে করার জন্য এই শরীরকে উপযুক্ত রাখার একটি অসাধারণ নির্দেশক এই যোগ।

   প্রাথমিকভাবে, যোগের লক্ষ্য ছিল ঈশ্বরের সাথে একত্ব লাভ করা। এমন নয় যে, “আমি ঈশ্বরের সাথে এক হতে চাই।”  এর মানে ছিল ঈশ্বরের প্রতি সেবা করার মনোভাব বৃদ্ধি করা। যেকোনো ধরনের যোগেই মূলত ভক্তিযোগকে লক্ষ্য রেখে এগোনো উচিত। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় (৬.৪৭) বলেছেন —  “যিনি শ্রদ্ধা সহকারে মদ্গত চিত্তে আমার ভজনা করেন, তিনিই সবচেয়ে অন্তরঙ্গভাবে আমার সঙ্গে যুক্ত এবং তিনিই সমস্ত যোগীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। সেটিই আমার অভিমত।”

   যোগ অনুশীলনের পদ্ধতি ও লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা হলো —  ব্যক্তি প্রথমে শরীর ও মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে, ঠিক যেন সুন্দরভাবে টিউন করা কোনো বাদ্যযন্ত্রের মতো। কিন্তু এটি কেবল একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। পরবর্তীকালে, সে এটিকে ঈশ্বরের সেবায় ব্যবহার করে। এটি যোগের পরিপূর্ণতা, যা ভক্তি—যোগ নামে পরিচিত। পরিশেষে বলা যায়, হঠযোগের মাধ্যমে কোনো যোগী নিখুঁতভাবে তার শরীর তৈরি করতে পারে। কিন্তু তা যদি ভগবানের সেবা ব্যতীত অন্য কোনো কাজে ব্যবহৃত হয়, তবে তা যথার্থ নয়। বরং, কৃষ্ণের সেবায় ব্যবহৃত শরীর হঠযোগের মাধ্যমে নিপুণভাবে তৈরি না হলেও তা সেই হঠযোগ অনুশীলনকারীর চেয়ে শ্রেয়।

   হঠযোগের নিয়মিত অনুশীলনের শারীরিক পুরস্কারে মুগ্ধ হয়ে কেউ আধ্যাত্মিক পথ ভুলে যোগের প্রকৃত লক্ষ্য থেকে পতিত হতে পারে। এটি আধুনিক সময়ে যোগ অনুশীলনকারীদের একটি বড় সমস্যা। পতঞ্জলি তার যোগসূত্রে যোগের এমন আরো অনেক ফল সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। কারণ এগুলো ব্যক্তিকে আধ্যাত্মিক পথে বিভ্রান্ত করতে পারে। “এই অতিপ্রাকৃত শক্তিগুলোর প্রতি আকৃষ্ট না হওয়ার ক্ষেত্রে অবিচল থাকা উচিত, তা না হলে সে পরমেশ্বরের প্রতি নিমগ্ন হতে পারবে না। প্রকৃতপক্ষে, এই শক্তিগুলো জড় বন্ধন এবং যোগের উন্নত অবস্থা থেকে পতনেরও কারণ হতে পারে।” (যোগসূত্র ৩.৫১)

সত্ত্বগুণ সম্পর্কে সতর্ক থাকুন

যোগ তার অনুশীলনকারীদের সাধারণত সত্ত্বগুণ অবস্থায় উন্নীত করে, যা উপকারী হতে পারে, কিন্তু এটি ক্ষতিকারকও হতে পারে। এর উপকারিতা স্পষ্ট —  উন্নত চেতনা, ধর্মীয় কার্যকলাপে আগ্রহ, আরো উন্নতির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি প্রভৃতি। তবে যোগ এমনও হতে পারে যে, এটি অনুশীলনকারীদের যোগের পরম লক্ষ্য অর্জনের পথে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সত্ত্বগুণ অনেকসময় যোগ অনুশীলনকারীদের মধ্যে হঠযোগী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দিতে পারে এবং সেই ধারার জীবনযাত্রার প্রতি আসক্তি সৃষ্টি করতে পারে।

আধ্যাত্মিকতার এই স্তরে যোগীরা এক প্রকার তৃপ্তি অনুভব করেন। তারা মনে করতে পারেন যে, তারা ইতোমধ্যেই সব জানেন এবং আর উন্নতি করার প্রয়োজন নেই। যখন তারা নিজেদের এমন তৃপ্ত মনে করেন, তখন তারা আর ভাবার অবকাশ পায় না যে তারা আরো সুখী হতে পারে।

   কিন্তু এর চেয়ে উচ্চতর স্তরও রয়েছে। প্রাচীন যোগ গ্রন্থগুলো সাধারণ যোগ অনুশীলন থেকে প্রাপ্ত সুখের তুলনা করে বলেছে, “ভক্তি—যোগের অনুশীলনে যে সুখের সাগর পাওয়া সম্ভব, সাধারণ যোগ অনুশীলনে প্রাপ্ত সুখ সেখানে এক মুঠো জলের সমতুল্য।” অর্থাৎ, কেউ হঠযোগ অনুশীলন করুক বা না করুক, ভক্তি—যোগের পথে ধীরে ধীরে তার অগ্রসর হওয়া উচিত এবং প্রেমময় মনোভাব নিয়ে ভগবানের প্রতি ভক্তিমূলক সেবা সম্পাদন করা উচিত। একজন যথার্থ আধ্যাত্মিক গুরুর দ্বারা পরিচালিত হয়ে একটি নিঃস্বার্থ মনোভাব বিকশিত করা উচিত।

কীভাবে শুরু করবেন

তাহলে ভক্তি—যোগ এবং হঠযোগের মধ্যে সমন্বয় করা কীভাবে সম্ভব? কীভাবে এমনকি সাধারণ যোগ অনুশীলনে ইতোমধ্যে যুক্ত থাকলেও  কেউ ভক্তিযোগের সরল অনুশীলনে নিজেকে যুক্ত করতে পারে?  প্রথমে, মন্ত্রধ্যান শিখুন, শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র নাম জপ করার অনুশীলন করুন। সেই ব্যক্তির কাছ থেকে শিক্ষা নিন, যিনি এমন এক গুরুপরম্পরা থেকে দীক্ষা প্রাপ্ত হয়েছেন, যে পরম্পরা এই পবিত্র হরিনাম বিতরণের জন্য প্রসিদ্ধ। গুরুদেব যে ভক্তিলতা বীজ হৃদয়ে বপন করেন, জপ করা হলো সেই ভক্তিলতাকে জলসিঞ্চন করা।

   বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যোগ স্টুডিওগুলোতে কীর্তন ও শ্রবণ খুবই জনপ্রিয়। তবে অনুশীলনকারীকে অবশ্যই সঠিকভাবে হরিনাম করতে শিখতে হবে যাতে এটি পূর্ণ শক্তি প্রদান করতে পারে এবং ভক্তি—যোগের প্রকৃত ফলাফল প্রদান করতে পারে। এই কলিযুগে কেবল যথাযথ জপ করার মাধ্যমে ব্যক্তি গভীরভাবে আত্ম উপলব্ধি লাভ করতে পারে। শ্রীমদ্ভাগবতমে (১২.৩.৫২) বলা হয়েছে: “সত্যযুগে বিষ্ণুর ধ্যানের মাধ্যমে, ত্রেতাযুগে যজ্ঞের মাধ্যমে এবং দ্বাপরযুগে ভগবানের পূজার্চনার মাধ্যমে যে ফল লাভ করা যেতো, কলিযুগে শুধু হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপের মাধ্যমে সেই ফল লাভ করা যায়।”

   এই জপ ভক্তি—যোগের সার, যা সাধারণভাবে যোগের সার। অর্থাৎ হরিনাম হচ্ছে সারাতিসার। এর কারণ, জপের মাধ্যমে ব্যক্তি শিখে যায়, কীভাবে নিজের হৃদয়কে সমস্ত আত্মার আত্মা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে নিবেদন করতে হয়। এটাই ঈশ্বরের সাথে একত্ব লাভ করার প্রকৃত উপায়। পতঞ্জলি ঈশ্বর—প্রণিধান সম্পর্কে বলতে গিয়ে, পূর্ণ ভক্তিভাবে ঈশ্বরের প্রতি নিজেকে সমর্পণের কথা বলেছেন। এটিই যোগের মূল উদ্দেশ্য।  

— হরেকৃষ্ণ

ভাষান্তর: রাজেশ রায়

যোগ ও আসন কি একই?
যোগ ও আসন কি একই?
সংকটে ভগবানের নাম জপ  কেন করবেন?
সংকটে ভগবানের নাম জপ কেন করবেন?
শ্রীনৃসিংহ চতুর্দশী
শ্রীনৃসিংহ চতুর্দশী
শ্রীরামচন্দ্রের  আবির্ভাব
শ্রীরামচন্দ্রের আবির্ভাব
শুদ্ধভাবে হরিনাম জপের  আটটি ব্যবহারিক কৌশল
শুদ্ধভাবে হরিনাম জপের আটটি ব্যবহারিক কৌশল
সুখের মাপকাঠি
সুখের মাপকাঠি
ধার্মিকের গুণাবলি কেমন  হওয়া উচিত?
ধার্মিকের গুণাবলি কেমন হওয়া উচিত?
বৈদিক শাস্ত্রে  তিন মহীয়সী মাতা
বৈদিক শাস্ত্রে তিন মহীয়সী মাতা
সনাতন ধর্মে  পরমতসহিষ্ণুতা ও সামাজিক সহাবস্থান
সনাতন ধর্মে পরমতসহিষ্ণুতা ও সামাজিক সহাবস্থান
প্রতিকূল পরিস্থিতিতে  কীভাবে স্থির থাকবেন?
প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কীভাবে স্থির থাকবেন?